ভূতের বিচার

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

Author:अनाहिता Anahita

এইরূপে আবেদ আলি কিয়দ্দিবস পর্য্যন্ত সেই কর্ম্মচারীর নিকট বিশেষরূপ সাহায্য পাইতে লাগিল। তাঁহাকে বিবিধরূপে পরীক্ষা করিয়া আবেদ বেশ বুঝিতে পারিল যে, ঐ কর্ম্মচারীর দ্বারা তাহার কোনরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই; অধিকন্তু সরকারি কার্য্যে সাহায্য করিতে গিয়া যদি সে কোনরূপে বিপদগ্রস্ত হয়, তাহা হইলেও ঐ কর্ম্মচারী তাহাকে বিপদ হইতে আশু উদ্ধার করিবেন।

 মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া, সে একদিবস সেই কর্ম্মচারীকে কহিল, “আমি আপনার নিকট হইতে অনেক অর্থ গ্রহণ করিয়াছি, কিন্তু এ পর্য্যন্ত আমি আপনার বিশেষ কোন কার্য্য করিয়া উঠিতে পারি নাই; ইহার নিমিত্ত আমি মনে মনে অত্যন্ত লজ্জিত আছি। এখন আমি স্থির করিয়াছি যে, অভাব পক্ষে পনের দিবসের মধ্যে একবার একাকী বহির্গত হইব। ইহার মধ্যে আপনি আমার কোনরূপ সংবাদ লইবার চেষ্টা করিবেন না।

 কর্ম্ম। তুমি কোথায় যাইবে?

 আবেদ। তাহা আমি এখন আপনাকে বলিব না, আর বলিবই বা কি? আমি যে কোথায় যাইব, তাহা আমি এখন নিজেই জানি না, ইচ্ছা করিয়াছি, আমি কোনরূপে আর একবার ডাকাইত দলের সহিত মিশিব, যদি কৃতকার্য্য হইতে পারি, তাহা হইলে দলপতির সহিত সকলকেই ধরাইয়া দিয়া আপনার ঋণ হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিব।

 কর্ম্ম। কতদিন পরে আবার দেখা হইবে?

 আবে। তাহা আমি এখন বলিতে পারি না। কিন্তু যতদিনই হউক না কেন, পনের দিনের মধ্যে আমি একবার আসিয়া আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব ও কতদূর কৃতকার্য্য হইতে পারিয়াছি, তাহাও আমি আপনাকে বলিয়া যাইব। কিন্তু—

 কর্ম্ম। কিন্তু কি?—

 আবে। আমার পরিবারবর্গ?

 কর্ম্ম। তোমার পরিবারবর্গের নিমিত্ত তোমাকে ভাবিতে হইবে না, সে ভার আমার উপর রহিল, তাহাদিগের সংবাদ আমি সর্ব্বদা গ্রহণ করিব ও তাহাদিগের নিমিত্ত যাহা কিছু খরচ হইবে, তাহা এখন আমি যেরূপভাবে দিতেছি, সেইরূপ ভাবেই দিয়া আসিব; সে সম্বন্ধে তোমাকে আদৌ কোনরূপ ভাবিতে হইবে না।

 এই বলিয়া আবেদ আলি কর্ম্মচারীর নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া, সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল। সে যে কোথায় গেল, কেহ জানিল না, বা কেহই বলিতে পারিল না। আট দশ দিবস কেহ তাহাকে আর সেই স্থানে দেখিতে পাইল না, বা তাহার কোনরূপ সংবাদও পাওয়া গেল না। দ্বাদশ দিবসে সে হঠাৎ কোথা হইতে আসিয়া সেই কর্ম্মচারীর সহিত সাক্ষাৎ করিল, ও কহিল, যে দলের দ্বারা আজ কাল ডাকাইতি হইতেছে, আমি তাহার সন্ধান করিয়া আসিয়াছি, যদি অনুমতি হয়, আমি তাহার ভিতর গিয়া প্রবিষ্ট হই।

 কর্ম্ম। কিরূপে তুমি উহার ভিতর প্রবিষ্ট হইবে?

 আবে। উহাদিগের দলভুক্ত হইয়া উহাদিগের সহিত ডাকাইতি করিতে হইবে।

 কর্ম্ম। ডাকাইতি না করিলে তুমি কি উহাদিগকে ধরাইতে পারিবে না?

 আবে। না।

 কর্ম্ম। কেন?

 আবে। দলভুক্ত না হইলে উহারা আমার কথায় বিশ্বাস করিবে কেন?

 কর্ম্ম। আচ্ছা, তাহাই হইবে; কিন্তু এক কাজ করিতে হইবে। আমার কথা মত ডাকাইতি করিতে গিয়া যদি কোন গতিকে ধৃত হও, তাহা হইলে যাহাতে আমি তোমাকে বাঁচাইতে পারি, অগ্রে তাহার বিশেষ বন্দোবস্ত করিতে হইবে, পরে ডাকাইতি করিতে তোমাকে অনুমতি দিব। এখন বল দেখি, তুমি যে দলের কথা কহিতেছ, সেই দল এই স্থান হইতে কতদুরে অবস্থিতি করে?

 আবে। তাহারা নানা স্থানে বাস করে, কিন্তু কার্য্য করিবার সময় যে স্থানে সমবেত হয়, সেই স্থান এখান হইতে প্রায় চল্লিশ ক্রোশ দূরে।

 কর্ম্ম। তুমি ততদূর গিয়াছিলে?

 আবে। না যাইলে কার্য্য উদ্ধার করিব কিরূপে?

 কর্ম্ম। ঐ দলের দলপতি কে?

 আবে। দলপতির কথা বলিবেন না, সে বড় ভয়ানক কথা। আমি যে হানিফ খাঁকে ধরাইয়া দিয়াছিলাম, সে মরিয়া ভূত হইয়াছে। ভূত হইয়াও সে আপন কার্য্য পরিত্যাগ করে নাই। সে এখনও ডাকাইত দলের দলপতি। সে দলপতির কার্য্য করে বটে, কিন্তু নিজে কিছুই গ্রহণ করে না। তাহার অংশে যাহা হয়, সে তাহা উড়াইয়া লইয়া গিয়া এক এক গ্রামের এক এক স্থানে ফেলিয়া দেয়, যে পায় সেই লয়, উহাতেই তাহার আমোদ।

 কর্ম্ম। তুমি তাহাকে দেখিয়াছ?

 আবে। দেখিয়াছি।

 কর্ম্ম। সে তোমাকে চিনিতে পারিয়াছিল?

 আবে। খুব পারিয়াছিল।

 কর্ম্ম। তুমি যে তাহাকে ধরাইয়া দিয়াছিলে, তাহার নিমিত্ত সে তোমাকে কিছু বলে নাই?

 আবে। না। আমি যে তাহাকে ধরাইয়া দিয়াছিলাম, তাহা সে জানিতে পারে নাই বা বুঝিতে পারে নাই।

 কর্ম্ম। তাহার চেহারা এখন কিরূপ?

 আবে। পূর্ব্বে যেরূপ ছিল, এখনও ঠিক সেইরূপ আছে, তবে পূর্ব্বের অপেক্ষা সে এখন কিছু কাহিল হইয়াছে। প্রভেদের মধ্যে, তাহার কথা একেবারে খোঁনা হইয়া গিয়াছে; এমন কি, তাহার কথা সহজে বুঝিয়া উঠিতে পারা যায় না।

 কর্ম্ম। তাহাকে দেখিয়া তোমার ভয় হইয়াছিল?

 আবে। দলের একজন লোক আমাকে সঙ্গে করিয়া তাহার নিকট লইয়া যায়, ভূতের কথা শুনিয়া প্রথমেই আমি অতিশয় ভয় পাইয়াছিলাম, পরে তাহাকে দেখিয়া আমি এরূপ ভীত হইয়া পড়ি যে, কিছুক্ষণ পর্য্যন্ত আমার সংজ্ঞা থাকে না। পরে যখন আমার সংজ্ঞা হয়, তখন তিনি আমাকে কহেন, “তোমার কোন ভয় নাই, দলের কোন লোকের আমা হইতে কিছুমাত্র ভয় নাই, আমার দ্বারা তাহাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হওয়া দুরে থাকুক, অপর কেহ তাহাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট করিতে পারিবে না। যে কোনরূপে অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করিবে, আমি জানিতে পারিলেই, তাহার ঘাড়টী মট্‌কাইয়া রাখিয়া আসিব। তুমি আমার দলে বহুদিন ছিলে, যাও, পুনরায় দলভুক্ত হও। এই কথা বলিয়াই তিনি সেই স্থান হইতে অন্তর্দ্ধান হইলেন, আর তাঁহাকে সেই স্থানে দেখিতে পাইলাম না।

 কর্ম্ম। কোন্ স্থানে তোমার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল?

 আবে। একটী প্রকাণ্ড মাঠের মধ্যস্থলে বৃহৎ ও বহু পুরাতন একটী অশ্বত্থবৃক্ষ আছে, তাহার নিকট একটী বৃহৎ পুষ্করিণী, ঐ পুষ্করিণীর চতুস্পার্শ্বে ভয়ানক জঙ্গলে আবৃত, দিনমানে ঐস্থান বাঘ ভালুকের আবাস স্থল, কোন লোক ভুলক্রমেও সেই স্থানে যায় না, সকলেই জানে, ঐস্থানে ঐ অশ্বত্থ গাছের উপর যত ভূতের আবাস-স্থল।

 কর্ম্ম। ঐ স্থান তুমি আমাদিগকে দেখাইতে পারিবে?

 আবে। তাহা পারিব না কেন?

 কর্ম্ম। তোমার কি অনুমান হয় যে, ঐ ভূত ঐ স্থানেই বাস করিয়া থাকে?

 আবে। তাহা আমি ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। ভূতের বাসস্থানের ঠিক কি?

 কর্ম্ম। এ বিষয়ে তোমাকে উত্তমরূপে সন্ধান করিতে হইবে।

 আবে। আমি তো তাহারই চেষ্টায় আছি, কিন্তু উহাদিগের সহিত ডাকাইতি করিতে প্রবৃত্ত না হইলে উহারা আমাকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করিবে কেন?

 কর্ম্ম। আমি তোমাকে সে বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছি, তাহার জন্য তোমার কোন চিন্তা নাই। এখন তুমি তোমার বাড়ীতে যাও, কল্য আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিও।

 আমার কথা শুনিয়া আবেদ আলি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল, আমি আমার ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারী ও সেই জেলার সর্ব্বপ্রধান বিচারককে সমস্ত কথা বলিলাম; তাঁহারা অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া কহিলেন, ঐ উপায়ে যদি ডাকাইতের দল ধরা পড়ে, তাহা হইলে ক্ষতি নাই। কিন্তু পূর্ব্ব হইতেই এরূপ বন্দোবস্ত করিতে হইবে যে, ডাকাইতি করিবার সমর সকলকে ধৃত করিতে হইবে।

 পরদিবস প্রত্যূষে আবেদ আলি আসিয়াই সেই কর্ম্মচারীকে কহিল, “কোনরূপ বন্দোবস্ত করিতে সমর্থ হইয়াছেন কি?

 কর্ম্ম। হাঁ, তুমি অবলীলাক্রমে ডাকাইতের দলে মিশিতে পার।

 আবে। আর ডাকাইতি?

 কর্ম্ম। তাহাও করিতে পারিবে, কিন্তু একটী কথা আছে।

 আবে। কি?

 কর্ম্ম। এরূপ কোন উপায় করিতে হইবে যে, ডাকাইতি করিবার সময় যাহাতে আমারা উহাদিগকে ধরিতে পারি।

 আবে। যদি আপনারা তাহা করিতে চাহেন, তাহা হইলে বিশেষ কষ্টসাধ্য হইলেও আমি তাহার বন্দোবস্ত করিব। কিন্তু ঐরূপে কার্য্য করিতে আমি নিষেধ করি।

 কর্ম্ম। কেন নিষেধ কর?

 আবে। তাহাতে উভয় পক্ষে অনেক খুন জখম হইবার সম্ভাবনা।

 কর্ম্ম। তাহা জানি, কিন্তু এই স্থানের সর্ব্বপ্রধান বিচারপতির ঐরূপ ইচ্ছা।

 আবে। যদি তাঁহার ঐরূপ ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে সেইরূপই বন্দোবস্ত করিব।

 কর্ম্ম। আমরা অগ্রে কিরূপে জানিতে পারিব যে, কবে ও কোন্ সময় এই কার্য্য হইবে?

 আবে। তাহা হইলে এক কার্য্য করিতে হইবে। আমার সহিত একটী বিশ্বাসী লোক দিতে হইবে, আর একজন দ্রুত অশ্বারোহীরও যোগাড় করিতে হবে। যে গ্রামে বসিয়া যে সময় ডাকাইতি করিবার সমস্ত ঠিক হইবে, আমি সেই বিশ্বাসী লোককে সেই গ্রামের কোন স্থানে রাখিয়া দিব। যেমন ডাকাইতির স্থান ও সময় স্থির হইবে, অমনি আমি তাহাকে সেই সংবাদ প্রদান করিব। অশ্বারোহীকে কোন দূরবর্ত্তী গ্রামে থাকিতে হইবে। লোক ঐ সংবাদ অশ্বারোহীকে প্রদান করিলে, সে দ্রুত অশ্বচালনা করিয়া আপনার নিকট আগমন পূর্ব্বক ঐ সংবাদ প্রদান করিবে, তখন আপনারা সদলবলে ডাকাইতির স্থানে উপস্থিত হইয়া ডাকাইতি করিবার সময় আমাদিগকে ধরিবেন। যদি এইরূপ বন্দোবস্ত করিতে পারেন, তাহা হইলে কার্য্যসিদ্ধ হইতে পারিবে, কিন্তু বিশেষ বিশ্বাসী লোক না হইলে সকল কার্য্য নষ্ট হইয়া যাইবে ও আমাদিগের সমস্ত মন্ত্রণা প্রকাশ হইয়া পড়িবে, তাহা হইলে পরিশেষে আর কোন কার্য্যই সহজে সম্পন্ন হইবে না।

 আবেদ আলির কথা শুনিয়া কর্ম্মচারী বুঝিতে পারিলেন যে, সে যাহা বলিতেছে, তাহা যুক্তিসঙ্গত। এখন ঐরূপ বিশ্বাসী লোক ও অশ্বারোহী কোথায় পাওয়া যাইবে?

 এ সম্বন্ধে ঐ কর্ম্মচারী তাঁহার ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারীর সহিত পরামর্শ করিলেন ও পরিশেষে ইহাই সাব্যস্ত হইল যে, ঐ কর্ম্মচারীই আবেদ আলির সহিত গমন করিবেন ও জেলার অশ্বারোহী পুলিসের যিনি নেতা, তিনিও অশ্বারোহণে গমন করিয়া নিকটবর্ত্তী কোন গ্রামে অপেক্ষা করিবেন।

 ঊর্দ্ধতন কর্ম্মচারীর সহিত পরামর্শ করিয়া যাহা সাব্যস্ত হইল, তিনি তাহা আবেদ আলিকে কহিলেন। আবেদ আলি ঐ প্রস্তাবে সম্মত হইয়া পুনরায় তাহার বাড়ী হইতে বহির্গত হইল। এবার সেই কর্ম্মচারীও তাহার সপ্তম পরিচ্ছেদ। সহিত গমন করিলেন। তিনি দূরে দূরে আবেদ আলি ও কর্মচারীয় জেলা হইতে থাকিয়া তাহার সহিত গমন করিলেন। তিনি দূরে দূরে থাকিয়া তাহার অনুসরণ করিতে লাগিলেন। যে গ্রামে যেরূপভাবে অবস্থিতি করিলে তাঁহার উপর অপর কাহারও কোনরূপ আদৌ সন্দেহ হইতে না পারে, সেইরূপভাবে আত্ম-পরিচয় প্রদান করিতে লাগিলেন। কর্ম্মচারী ভদ্রলোক সুতরাং ভদ্রবেশেই তাঁহাকে নানা গ্রামে গমন করিতে হইল; সকল স্থানেই তিনি স্কুল ও পাঠশালা-পরিদর্শক বলিয়া আত্ম-পরিচয় প্রদান পূর্ব্বক স্কুল বা পাঠশালা পরিদর্শন করিতে করিতে গমন করিতে লাগিলেন, যে সকল গ্রামে দুই চারি দিবস অবস্থিতি করিতে হইল, তিনি পীড়িত হইয়াছেন বলিয়া সেই সেই স্থানে অবস্থিতি পূর্ব্বক সময় অতিবাহিত করিতে লাগিলেন।

 অশ্বারোহী ঐ প্রদেশে ঘোড়া ও গরু খরিদ করিতে আসিয়াছেন, এই পরিচয়ে নানা স্থানে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। কোন কোন স্থানে গরু বা ঘোড়া খরিদ করিবার জন্য বায়নার স্বরূপ তাহাদিগকে কিছু কিছু অর্থও প্রদান করিতে লাগিলেন।

 এই প্রকারে আবেদ আলি ও তাহার সমভিব্যাহারী কর্ম্মচারীদ্বয় আপনাপন কার্য্য উদ্ধার মানসে দিন যামিনী অতিবাহিত করিতে লাগিলেন।

Comments
Please login to comment. Click here.

It is quick and simple! Signing up will also enable you to write and publish your own books.

Please join our telegram group for more such stories and updates.

Books related to ভূতের বিচার